মাঝরাতে জনরোষের আতঙ্ক, সপরিবারে দিনহাটা ছাড়লেন দাপুটে নেতা উদয়ন গুহ

সময়ের চাকা ঘুরতেই দম্ভের পতন ঘটল উত্তরবঙ্গ উন্নয়নমন্ত্রী উদয়ন গুহর। কয়েক দিন আগেও যাঁর প্রতাপে দিনহাটার রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রিত হতো, পরাজয় নিশ্চিত হতেই তাঁকে রাতের অন্ধকারে এলাকা ছাড়তে হলো। সোমবার রাত ৩টে নাগাদ পুলিশ ও কেন্দ্রীয় বাহিনীর কড়া নিরাপত্তায় সপরিবারে পৈতৃক ভিটে ত্যাগ করেন তিনি। স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, সম্ভাব্য জনরোষের হাত থেকে বাঁচতেই এই ‘পলাতক’ হওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন একসময়ের এই অপরাজেয় নেতা।

থানায় আশ্রয় ও নাটকীয় প্রস্থান

সোমবার সন্ধ্যায় ভোটের ফল প্রতিকূল হওয়ার পরেই পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে শুরু করে। পরাজয় নিশ্চিত বুঝে উদয়ন গুহ মেজাজ হারান এবং তাঁর পুত্র সায়ন্তন গুহ আত্মগোপন করেন। ক্ষুব্ধ জনতার হাত থেকে বাঁচতে রাত ১০টা নাগাদ সশরীরে দিনহাটা থানায় আশ্রয় নেন উদয়ন। সেখানে কয়েক ঘণ্টা অবস্থানের পর কেন্দ্রীয় বাহিনীর নিরাপত্তা দাবি করেন তিনি। দীর্ঘ টানাপোড়েন শেষে রাত আড়াইটে নাগাদ বাহিনীর ঘেরাটোপে বাড়ি ফিরে দ্রুত প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র গুছিয়ে এলাকা ত্যাগ করেন। কোচবিহারের মূল রাস্তা এড়িয়ে সিতাই ও মাথাভাঙ্গা হয়ে চ্যাংরাবান্ধা দিয়ে তাঁর কনভয় শিলিগুড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দেয়।

দাপটের অবসান ও স্বস্তির নিঃশ্বাস

মঙ্গলবার সকাল থেকেই দিনহাটার জনমানসে এক ভিন্ন ছবি ধরা পড়েছে। চৌপথি থেকে মদনমোহন মন্দির— সর্বত্রই সাধারণ মানুষের ভিড় লক্ষ্য করা গেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের একাংশ জানিয়েছেন, দীর্ঘদিনের দাপট ও অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পেতে তাঁরা মন্দিরে মানত করেছিলেন। জয়ী প্রার্থী নয়, বরং উদয়নের পরাজয় উদ্‌যাপন করতেই মন্দিরে মন্দিরে পুজো দেওয়ার ধুম পড়ে যায়। একসময়ের রাজনৈতিক সতীর্থদের হুমকি দেওয়া কিংবা বিরোধীদের ‘হাঁটু ভেঙে দেওয়া’র নিদান দেওয়া এই নেতার পরিণতি এখন কোচবিহারের রাজনীতির প্রধান চর্চার বিষয়।

প্রভাব ও রাজনৈতিক ইঙ্গিত

উদয়ন গুহর এই প্রস্থান কেবল একজন নেতার পরাজয় নয়, বরং ক্ষমতার নশ্বরতার এক বড় দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা হচ্ছে। যে কেন্দ্রীয় বাহিনীকে তিনি প্রতিনিয়ত আক্রমণ করতেন, শেষ পর্যন্ত সেই বাহিনীর সাহায্য নিয়েই তাঁকে নিজের গড় ছাড়তে হলো। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ মানুষের ওপর চালানো মানসিক ও রাজনৈতিক চাপই এই প্রবল জনরোষের মূল কারণ। এই ঘটনার ফলে উত্তরবঙ্গের রাজনীতিতে তৃণমূলের দীর্ঘদিনের একক আধিপত্য বড়সড় ধাক্কা খেল বলে মনে করা হচ্ছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *