দুর্গার হাত কি সত্যিই ৩২টি? জানুন পৌরাণিক অজানা সত্য!

বার্তা ডেস্কঃ

সরকারি বিজ্ঞাপনে দেবী দুর্গার ১১টি হাতের চিত্রায়ণ ঘিরে সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল বিতর্ক ও সমালোচনার ঝড় উঠেছে। এই বিতর্কের আবহেই প্রশ্ন উঠেছে—পুরাণ ও ইতিহাস অনুযায়ী দেবীর হাত আসলে ক’টি? মূর্তিশাস্ত্র ও পুরাণবিদদের মতে, দুর্গার হাতের সংখ্যা সর্বদাই জোড়সংখ্যক। ২, ৪, ৮, ১০, ১২, ১৬, ১৮ এমনকি ৩২ হাতের দুর্গার অস্তিত্ব ও প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণ মিললেও ৩, ৫, ৭ বা ১১ হাতের দুর্গার কোনো শাস্ত্রীয় ভিত্তি নেই।

১০ দেবতা ও ১০ অস্ত্রের প্রচলিত ধারণার ভুল: সাধারণ বিশ্বাস অনুযায়ী ১০ জন দেবতা দেবীকে ১০টি অস্ত্র দিয়েছিলেন বলে তিনি ‘দশভুজা’। তবে মার্কণ্ডেয় পুরাণের ‘দেবীমাহাত্ম্য’ (চণ্ডীপাঠ) বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, শিব, বিষ্ণু, ইন্দ্র, ব্রহ্মা সহ প্রায় ১৫ জন দেবতা দেবীকে ২০টিরও বেশি অস্ত্র, পোশাক ও অলঙ্কার প্রদান করেছিলেন। ফলে ‘এক দেবতা, এক অস্ত্র, এক হাত’—এই সমীকরণটি শাস্ত্রসম্মত নয়। চণ্ডীর বর্ণনা অনুযায়ী মহিষাসুর নিধনের দেবী মূলত আঠারোভুজা (মহালক্ষ্মী)। এ ছাড়া শুম্ভ-নিশুম্ভ বধের দেবী অষ্টভুজা এবং কিছু বর্ণনায় দেবীর সহস্র বাহুর উল্লেখও রয়েছে।

ইতিহাস ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন: প্রত্নতত্ত্ববিদ শুভ মজুমদারের তথ্য অনুযায়ী, রাজস্থানের নাগৌরে প্রাপ্ত প্রাচীনতম মহিষাসুরমর্দিনীর মূর্তিটি ৪ হাতের। আবার উত্তর দিনাজপুরের বেতনা থেকে ৩২ হাতযুক্ত দুর্গার মূর্তিও আবিষ্কৃত হয়েছে। ১৮৭১ সালে প্রতাপচন্দ্র ঘোষের লেখা ‘দুর্গা পূজা’ গ্রন্থে আধুনিক ১০ হাতের প্রতিমার রূপটি বিস্তারিতভাবে উঠে আসে, যা পরবর্তীতে বাঙালি শিল্পীরা ‘স্ট্যান্ডার্ড’ হিসেবে গ্রহণ করেন।

বাহুর আসল রূপক ও বাঙালির ভাবধারা: পুরাণবিদ নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর মতে, দেবীর হাতের এই সংখ্যা মূলত অসীম সম্মিলিত শক্তির এক দৃশ্যমান রূপক। দেবতারা একা অসুর বধ করতে না পেরে নিজেদের তেজ এক সুতোয় বেঁধেছিলেন। যত বেশি হাত, শক্তির প্রকাশও তত বেশি। শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসও দেবীর রূপ বর্ণনা করতে গিয়ে ১৮ হাত থেকে শুরু করে ২ হাত এবং শেষে নিগুণ পরম রূপের কথা বলেছিলেন।

লক্ষ্মণ সেনের আমল থেকে প্রচলিত দুর্গাপ্রতিমাকে বাঙালি তার নিজস্ব সংস্কৃতিতে আপন করে নিয়েছে। শাস্ত্রের কঠোর ও রণচণ্ডী দেবীকে সন্তানসহ বাপের বাড়িতে আসা এক স্নেহময়ী মায়ের রূপ দিয়েছে বাংলার মাটি। ফলে বাঙালি কেবল বাহুর সংখ্যা বা মূর্তির পুজো করে না, পুজো করে দেবীর অসীম শক্তির ও ভালোবাসার ভাবের।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *