লাল, সবুজ ও কালো দুর্গার রহস্য কী? জেনে নিন এর আসল শাস্ত্রীয় ব্যাখ্যা!
বার্তা ডেস্কঃ
September 28, 20269:38 am
শাস্ত্রমতে উমার গায়ের রং আসলে কেমন? সোনাঝরা হলুদ নাকি আঁধার কালো?
দেবী দুর্গা মানেই কি তপ্ত সোনার মতো উজ্জ্বল কান্তি? নাকি শিউলি ফুলের বোঁটার মতো নরম রঙের আভা? আমাদের চিরপরিচিত দুর্গা প্রতিমার মুখশ্রী উজ্জ্বল হলুদ কিংবা স্বর্ণবর্ণ হলেও, সমগ্র বাংলা ঘুরে দেখলে মায়ের নানা বিচিত্র রূপের দেখা মেলে। কোথাও তিনি রক্তবর্ণা, কোথাও গাঢ় সবুজ, কোথাও বা আঁধার রাতের মতো কৃষ্ণবর্ণা। তাহলে শাস্ত্র অনুযায়ী দেবীর প্রকৃত গাত্রবর্ণ কী?
ধ্যানমন্ত্র ও পুরাণের ব্যাখ্যা: দেবীর রূপ আসলে কেমন?
দেবী দুর্গার ধ্যানমন্ত্রের শুরুতেই তাঁর রূপের স্পষ্ট বর্ণনা পাওয়া যায়:
‘জটাজুট সমাযুক্তাং অর্ধেন্দু কৃতশেখরাম্।
লোচনত্রয় সংযুক্তাং পূর্ণেন্দু সদৃশাননাম্।
অতসীপুষ্প বর্ণাভাং সুপ্রতিষ্ঠাং সুলোচনাম্…’
অর্থাৎ, দেবীর কপালে অর্ধচন্দ্র, মুখমণ্ডল পূর্ণিমার চাঁদের মতো এবং গায়ের রং অতসী ফুলের মতো। পল্লী বাংলায় অতসী ফুল মূলত উজ্জ্বল সোনালি-হলুদ রঙের হয়, তাই মৃৎশিল্পীরা দেবীকে প্রধানত এই বর্ণেই গড়ে তোলেন।
অন্যদিকে, মৎস্য পুরাণ ও বৃহদ্ধর্ম পুরাণে দেবীকে বলা হয়েছে ‘তপ্তকাঞ্চনবর্ণা’—যার অর্থ উত্তপ্ত বা গলানো সোনার মতো তপ্ত-সোনালি আভা। রামচন্দ্রের অকাল বোধনের সময়েও ব্রহ্মা বেলগাছের সবুজ পাতার মাঝে দেবী দুর্গাকে এই তপ্তকাঞ্চনবর্ণা বালিকা রূপেই ঘুমন্ত অবস্থায় দেখেছিলেন।
ব্যতিক্রমী বঙ্গ: রক্তবর্ণ থেকে কৃষ্ণ দুর্গার মহিমা
শাস্ত্রে সোনার মতো রূপের প্রাধান্য থাকলেও বাংলায় নানা অলৌকিক ঘটনা, স্বপ্নাদেশ কিংবা ঐতিহাসিক কারণে ভিন্ন রঙের দুর্গা পূজিত হন:
- রক্তবর্ণা (লাল): নদিয়ার নবদ্বীপের যোগনাথতলা, হুগলির উত্তরপাড়া ও বাঁশবেড়িয়ার রায় পরিবারে দেবী দুর্গা লাল রঙের।
- কৃষ্ণবর্ণা (কালো): বেলেঘাটার ভট্টাচার্য বাড়ি, নদিয়ার বাহিরগাছি গ্রাম এবং ক্যানিংয়ের নির্দিষ্ট কিছু পরিবারে ঘোর অমাবস্যার মতো কালো দুর্গার পুজো হয়।
- নীল ও সবুজ: কৃষ্ণনগর নাজিরাপাড়ায় দেবী নীলবর্ণা এবং বেশ কিছু জায়গায় সবুজ দুর্গার পুজো প্রচলিত রয়েছে।
বেদ ও উপনিষদ কী বলছে?
ঋগ্বেদ ও ছান্দোগ্য উপনিষদ অনুযায়ী, মহাবিশ্বের আদি রূপ তিনটি—‘লোহিতকৃষ্ণশুক্লাম’ (লাল, সাদা এবং কালো)। প্রকৃতির সত্ত্ব, রজো ও তমো—এই তিন গুণের সঙ্গেই দেবীর ভিন্ন ভিন্ন রঙের গভীর সম্পর্ক রয়েছে:
- রক্তিম বা লাল (রজো গুণ): দেবীর উৎপত্তি দেবতাদের সমবেত ‘তেজ’ বা অগ্নি থেকে। মহিষাসুরমর্দিনীর যুদ্ধংদেহী উগ্রচণ্ডা রূপ এই অগ্নিসদৃশ রক্তিম আভার প্রতীক।
- শ্বেত বা গৌরবর্ণ (সত্ত্ব গুণ): তপস্যার পর মানস সরোবরে স্নান করে দেবী পরম উজ্জ্বল শ্বেতশুভ্র ও সোনালি আভা ধারণ করেন, যা পরম শান্তির প্রতীক।
- কৃষ্ণবর্ণ বা কালো (তমো গুণ): চণ্ডী অনুযায়ী, দেবীর ক্রোধ থেকে আবির্ভূত হন কালরাত্রি বা কালী। আবার সৃষ্টিপূর্ব আদি-অন্ধকার এবং অশুভ শক্তির বিনাশের প্রতীক হিসেবেও কৃষ্ণবর্ণের তাৎপর্য অপরিসীম।
এছাড়া শ্রীশ্রীচণ্ডীতে বর্ণিত বিষ্ণুর ‘যোগনিদ্রা’ বা যোগমায়া রূপের বর্ণ ঘন নীল।
পরিশেষে:
যদিও সৃষ্টির ত্রিগুণ অনুযায়ী দেবী দুর্গা বিভিন্ন রূপে ও বর্ণে প্রকাশ পান, তবুও আবহমান কাল ধরে সনাতন ভাবনায় ‘অতসী পুষ্পবর্ণা’ এবং ‘তপ্তকাঞ্চনবর্ণা’ রূপটিই দুর্গা প্রতিমা গঠনে সর্বাধিক সমাদৃত হয়ে আসছে।