সুন্দরবনের অভিশাপ, মুক্তিপণ না দিলে জুটবে না প্রাণ!

বার্তা ডেস্কঃ

 

সুন্দরবনে বনদস্যুদের দৌরাত্ম্য: জিম্মি জীবন-জীবিকা, আতঙ্কে বনজীবীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক | সাতক্ষীরা

সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল সাতক্ষীরার উপকূলীয় অঞ্চলের বনজীবীরা বর্তমানে চরম নিরাপত্তা ঝুঁকিতে দিন কাটাচ্ছেন। সরকারি অনুমতির বাইরেও বনদস্যুদের কাছে বিপুল অংকের চাঁদা দিয়ে ‘পাশ’ বা অনুমতি নিতে বাধ্য হচ্ছেন জেলেরা। দস্যুদের চাঁদাবাজি, অপহরণ ও শারীরিক নির্যাতনের ফলে উপকূলের হাজার হাজার বনজীবীর জীবিকা এখন অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।

স্থানীয় বনজীবীদের অভিযোগ, গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর সুন্দরবনে দস্যু তৎপরতা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বর্তমানে বনে ৭ থেকে ৮টি সশস্ত্র দস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। এদের হাত থেকে রেহাই পেতে জেলেদের ভিন্ন ভিন্ন নোটের (যেমন: ৫ বা ১০ টাকার নোট) মাধ্যমে সাংকেতিক কার্ড সংগ্রহ করতে হয়। এই কার্ড না থাকলে বনে প্রবেশ করা আসাম্ভব।

গাবুরা ইউনিয়নের একাধিক জেলে জানিয়েছেন, এক একটি নৌকার জন্য ২০ হাজার থেকে শুরু করে লক্ষাধিক টাকা পর্যন্ত চাঁদা দিতে হয়। মুক্তিপণের টাকা দিতে না পেরে বহু জেলে দিনের পর দিন জঙ্গলে বন্দি থাকছেন। কামরুল ইসলাম ও আব্দুল করিমের মতো ভুক্তভোগী জেলেরা জানান, দস্যুদের ভয়ে তারা এখন আর বনে যেতে পারছেন না, ফলে পরিবার-পরিজন নিয়ে খাদ্য সংকটে পড়েছেন।

আত্মসমর্পণকারী সাবেক এক বনদস্যুর ভাষ্যমতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর সরকারি সহায়তা পাওয়া অনেকের ব্যবসা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় তারা পুনরায় দস্যুতার পথে ফিরেছে। দস্যুরা স্থানীয় পর্যায় থেকে রসদ ও আশ্রয় পাচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

সুন্দরবন পশ্চিম বিভাগের রেঞ্জ কর্মকর্তা শাহিনুর ইসলাম জানান, বনরক্ষীদের কাছে অত্যাধুনিক প্রাণঘাতী অস্ত্র না থাকায় সশস্ত্র দস্যু মোকাবিলা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। দস্যুদের মোকাবিলায় বন বিভাগের সীমাবদ্ধতার কথা স্বীকার করেছেন তিনি।

এদিকে কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে নিয়মিত অভিযানের দাবি করা হলেও ভুক্তভোগী জেলেদের ভাষ্য ভিন্ন। জেলেদের অভিযোগ, দস্যুরা স্থানীয় পর্যায়ে সক্রিয় থাকায় তথ্য ফাঁস হওয়ার ভয়ে তারা আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে যেতে সাহস পান না। ফলে, জীবনের নিরাপত্তা ও জীবিকার দাবিতে সাতক্ষীরার শ্যামনগরে বনজীবীরা সম্প্রতি সপ্তাহব্যাপী বিক্ষোভ মিছিল ও মানববন্ধন করেছেন। তারা এ বিষয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে স্মারকলিপিও প্রদান করেছেন।

সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কাওসার আজিজ জানান, বিষয়টি আইন-শৃঙ্খলা বিষয়ক সভায় আলোচনা হয়েছে। তবে শুধু একটি জেলায় অভিযান চালিয়ে এই সমস্যা সমাধান সম্ভব নয়। সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বন বিভাগ, কোস্টগার্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে একটি বড় ধরনের যৌথ অভিযানের ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন তিনি।

বনজীবীরা বলছেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কার্যকর ও স্থায়ী অভিযান ছাড়া সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল এই বিশাল জনগোষ্ঠীর জীবন রক্ষা করা সম্ভব নয়।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *