উত্তর কলকাতার অদেখা রহস্য, যেখানে দেবী পূজিতা হন ঘরের মেয়ের রূপে!
বার্তা ডেস্কঃ
উত্তর কলকাতার ঐতিহ্যে ঘেরা ‘ঘোমটা কালী’: এক অনন্য বিশ্বাস ও আস্থার প্রতীক
নিজস্ব প্রতিবেদক, কলকাতা: উত্তর কলকাতার বলরাম ঘোষ স্ট্রিটের এক নিভৃত কোণে অবস্থিত ‘ঘোমটা কালী’ মন্দির। শ্যামপুকুর থানার ঠিক বিপরীতে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে স্বমহিমায় বিরাজমান এই মন্দিরটি ভক্তদের কাছে কেবল একটি তীর্থস্থান নয়, বরং পরম নির্ভরতার এক ঠিকানাও। দেবীর মাথায় টানা ঘোমটা ও মুখাবয়বে ফুটে ওঠা স্নিগ্ধ রূপ এই মন্দিরকে করেছে অনন্য ও রহস্যময়।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়, ১৮৮৮ সালে তৎকালীন প্রভাবশালী জমিদার বলরাম ঘোষের বংশধর তুলসীরাম ঘোষ এক বিশেষ রাতে স্বপ্নে দেবী কালীকে প্রত্যক্ষ করেন। সেই স্বপ্নে মা কালীর রূপ ছিল অত্যন্ত শান্ত ও মায়াময়, যার মাথায় ছিল একটি পরিপাটি ঘোমটা। স্বপ্নাদেশ পাওয়ার পর তুলসীরাম ঘোষ সেই স্নিগ্ধ রূপটিই মূর্ত করে তোলার সিদ্ধান্ত নেন এবং অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে দেবীর মৃন্ময়ী মূর্তি প্রতিষ্ঠা করেন।
এই মন্দিরের পুজো ও রীতিনীতিও বেশ স্বতন্ত্র। শাস্ত্রীয় উপাচারে নিত্যপুজোর পাশাপাশি দেবীর ভোগে থাকে নুন ছাড়া তৈরি লুচি, পাঁচ রকমের ভাজা, বোঁদে ও হরেক রকম মিষ্টান্ন। ভক্তরা ভালোবেসে এই দেবীকে ‘ছোট ভবতারিণী’ বলেও সম্বোধন করেন। স্থানীয়দের বিশ্বাস, এই দেবী দক্ষিণাকালীর এক পরম শান্ত রূপ। তাই সাধারণ গৃহস্থ থেকে শুরু করে তন্ত্রসাধক—সবার কাছেই এই মন্দির গভীর আস্থার স্থান। বিপদে-আপদে এলাকাবাসী ছুটে আসেন মায়ের চরণে, এবং তাদের বিশ্বাস, খাঁটি মনে প্রার্থনা করলে মা কাউকে খালি হাতে ফেরান না।
মন্দিরের প্রতিষ্ঠার দিনটিকে স্মরণীয় করে রাখতে প্রতি বছর বাসন্তী পঞ্চমীর দিনে এখানে বিশেষ উৎসব ও মেলার আয়োজন করা হয়। এছাড়া কার্তিক মাসের অমাবস্যায়, অর্থাৎ কালীপুজোর রাতে ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়ে মুখরিত হয়ে ওঠে মন্দির প্রাঙ্গণ। দেড়শো বছরেরও বেশি সময় ধরে কলকাতার বুকে নিজস্ব ঐতিহ্য ও গাম্ভীর্য বজায় রেখে আজও এই ‘ঘোমটা কালী’ মন্দিরে দেবীর অলৌকিক মায়া ও আশীর্বাদ ছড়িয়ে আছে।