টার্গেট কি শুভেন্দুই ছিলেন? মধ্যমগ্রামে তাঁর আপ্তসহায়ক চন্দ্রনাথ খুনে সুপারি কিলারের সন্দেহ পুলিশের
রাজ্যে বিজেপি সরকারের শপথগ্রহণের মাত্র ৫২ ঘণ্টা আগে বুধবার রাতে উত্তর ২৪ পরগনার মধ্যমগ্রামে এক নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সাক্ষী থাকল বাংলা। দুষ্কৃতীদের গুলিতে ঝাঁঝরা হয়ে গেলেন বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর দীর্ঘদিনের আপ্তসহায়ক তথা বায়ুসেনার প্রাক্তন জওয়ান চন্দ্রনাথ রথ (৪২)। এই ঘটনায় লক্ষ্য শুধুমাত্র চন্দ্রনাথ ছিলেন, নাকি ওই গাড়িতে শুভেন্দু অধিকারী থাকতে পারেন ভেবে এই হামলা চালানো হয়েছিল— তা নিয়ে দানা বেঁধেছে রহস্য।
ফিল্মি কায়দায় ধাওয়া ও গুলিবৃষ্টি
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বুধবার রাত সাড়ে ৮টা নাগাদ কলকাতা থেকে মধ্যমগ্রামের ফ্ল্যাটে ফিরছিলেন চন্দ্রনাথ। তিনি পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার বোর্ড লাগানো একটি সাদা স্করপিও গাড়ির চালকের পাশের সিটে বসেছিলেন। দোহারিয়া এলাকায় ৪টি মোটরবাইকে আসা অন্তত ৮ জন দুষ্কৃতী এবং একটি রহস্যময় গাড়ি তাঁদের পথ আটকায়। এরপর পয়েন্ট ব্ল্যাঙ্ক রেঞ্জ থেকে পরপর ৬-১০ রাউন্ড গুলি চালানো হয়।
- আঘাত: চন্দ্রনাথের বুকের বাঁ দিকে দুটি গুলি লাগে। হাসপাতালে আনার আগেই তাঁর মৃত্যু হয়।
- আহত: চালক বুদ্ধদেব বেরার পেটে, হাতে ও বুকে ৩টি গুলি লেগেছে। তাঁর অবস্থা আশঙ্কাজনক।
- অস্ত্র: তদন্তকারীদের ধারণা, এই হামলায় অত্যাধুনিক ‘গ্লক ৪৭এক্স’ পিস্তল ব্যবহার করা হয়েছে, যা সাধারণত পেশাদার সুপারি কিলারদের হাতেই দেখা যায়।
তদন্তে উঠে এল ‘নকল’ নম্বর প্লেটের তথ্য
ঘটনাস্থলে রাতেই পৌঁছান রাজ্য পুলিশের ভারপ্রাপ্ত ডিজি সিদ্ধিনাথ গুপ্তা এবং সিআরপিএফ-এর ডিজি জ্ঞানেন্দ্র প্রতাপ সিং। ডিজি জানান, যে গাড়িটি দিয়ে চন্দ্রনাথের গাড়ির পথ আটকানো হয়েছিল, সেটি পুলিশ আটক করেছে। গাড়িটির নম্বর প্লেটটি ছিল নকল, যেখানে শিলিগুড়ির নম্বর ব্যবহার করা হয়েছিল। ঘাতক বাইক আরোহীরা হেলমেট পরে থাকায় তাদের চেনা কঠিন হচ্ছে, তবে সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখা হচ্ছে।
রাজনৈতিক চাপানউতোর ও সিবিআই তদন্তের দাবি
এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে রাজ্য রাজনীতিতে তীব্র উত্তেজনা ছড়িয়েছে:
- বিজেপির তোপ: রাজ্য সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য সরাসরি তৃণমূলকে দায়ী করে বলেন, “তৃণমূল গেরুয়া আবির মেখে নিজেদের অফিস ভাঙছে আর বিজেপি কর্মীদের খুন করছে। প্রাক্তন জওয়ানের এই মৃত্যু অত্যন্ত মর্মান্তিক।”
- তৃণমূলের পাল্টা চাল: তাৎপর্যপূর্ণভাবে তৃণমূল কংগ্রেস এই ঘটনার নিন্দা জানিয়ে আদালতের নজরদারিতে সিবিআই (CBI) তদন্ত দাবি করেছে। তাদের দাবি, গণতন্ত্রে হিংসার জায়গা নেই।
- বিক্ষোভ: ঘটনার পর ক্ষুব্ধ বিজেপি সমর্থকরা যশোর রোড অবরোধ করেন এবং ডিজিপির গাড়ি আটকে বিক্ষোভ দেখান। পরিস্থিতি সামাল দিতে এলাকায় বিশাল পুলিশ বাহিনী ও কেন্দ্রীয় বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে।
কে এই চন্দ্রনাথ রথ?
রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের প্রাক্তন ছাত্র চন্দ্রনাথ বায়ুসেনায় কাজ করার পর শুভেন্দু অধিকারীর ছায়াসঙ্গী হয়ে ওঠেন। তৃণমূল জমানা থেকে শুরু করে সাম্প্রতিক ভবানীপুর উপনির্বাচন— শুভেন্দুর সমস্ত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের নেপথ্যে অন্যতম ভরসা ছিলেন তিনি। তাঁর এই মৃত্যুতে ভেঙে পড়েছেন বিজেপি নেতৃত্ব। শনিবারের শপথগ্রহণের আগে এই ঘটনা রাজ্যের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির ওপর এক বড় প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিল।
প্রতিবেদক: বর্তমান ঠাকুর।