পাহাড়ের গুহায় রহস্যের ছাপ! সবুজ পাথর দেখে অবাক গবেষকরা, সামনে এল প্রাচীন মানব সভ্যতার ইঙ্গিত
পাহাড়ের দুর্গম উচ্চতায় কি হাজার হাজার বছর আগে মানুষের স্থায়ী বা নিয়মিত বসতি থাকা সম্ভব? দীর্ঘদিনের এই ঐতিহাসিক ধারণাকে চ্যালেঞ্জ জানিয়েছে স্পেনের এক সাম্প্রতিক প্রত্নতাত্ত্বিক আবিষ্কার। উত্তর-পূর্ব স্পেনের কেরালব্সের নুরিয়া উপত্যকায়, সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে প্রায় ২,২৩৫ মিটার (সাড়ে সাত হাজার ফুটের কাছাকাছি) উচ্চতায় একটি গুহায় মিলেছে আদিম মানুষের বসতি ও খনিজ প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্রের রোমহর্ষক নিদর্শন। ‘কোভা ৩৩৮’ নামের এই গুহাটি এখন বিজ্ঞানীদের কাছে প্রাচীন এক ‘ইন্ডাস্ট্রিয়াল হাব’ বা শিল্পকেন্দ্রের সমতুল্য।
রহস্যময় সবুজ পাথর ও তামার যোগসূত্র
বার্সেলোনা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানীদের এক গবেষণায় উঠে এসেছে যে, আজ থেকে প্রায় ৬০০০ বছর আগে অর্থাৎ নব্য প্রস্তর ও তাম্রযুগে এই উচ্চতায় মানুষের নিয়মিত যাতায়াত ছিল। গুহাটি থেকে উদ্ধার হয়েছে প্রায় ২০০টি ‘রহস্যময়’ সবুজ পাথর। বিজ্ঞানীরা পরীক্ষা করে দেখেছেন, এই পাথরগুলো আসলে ‘ম্যালাকাইট’, যা তামার আকরিক হিসেবে পরিচিত। গুহার ভেতর স্তরে স্তরে জমে থাকা কয়লা এবং উনুনের অবশেষ দেখে গবেষকদের ধারণা, এটি ছিল তামা গলানো এবং তা থেকে বিভিন্ন সরঞ্জাম তৈরির একটি প্রাচীন প্রক্রিয়াকরণ কেন্দ্র। সম্ভবত বছরের একটি নির্দিষ্ট ঋতুতে আদিম মানুষ এখানে এসে শিবির তৈরি করত এবং খনিজ উত্তোলনের কাজে লিপ্ত থাকত।
জীবনযাত্রার বৈচিত্র্য ও সভ্যতার নিদর্শন
গুহাটি থেকে কেবল তামার প্রমাণই নয়, পাওয়া গেছে প্রাচীন মানুষের জীবনযাত্রার নানা উপকরণও:
- বাসস্থানের প্রমাণ: খননকার্যে মিলেছে মাটির পাত্রের ভগ্নাংশ, পাথরের তৈরি উন্নত অস্ত্র এবং রান্নাবান্নার জন্য ব্যবহৃত উনুন।
- খাদ্যাভ্যাস: প্রচুর পরিমাণে প্রাণীর হাড় পাওয়া গেছে, যা থেকে স্পষ্ট যে সেখানে দীর্ঘ সময় অবস্থানের সময় মানুষ পশু শিকার করে আহার করত।
- অলঙ্কার ও সংস্কৃতি: ঝিনুক দিয়ে তৈরি লকেট এবং ভালুকের দাঁতের তৈরি লকেট উদ্ধার হয়েছে, যা আদিম মানুষের নান্দনিক বোধের পরিচয় দেয়।
- সমাধি: গুহার ভেতর থেকে একটি শিশুর কঙ্কালের অবশেষসহ বেশ কিছু দেহাংশ মিলেছে। এর থেকে প্রত্নতত্ত্ববিদরা মনে করছেন, খনিজ প্রক্রিয়াকরণ বা বসবাসের পাশাপাশি গুহাটিকে সমাধিস্থল হিসেবেও ব্যবহার করা হতো।
ঐতিহাসিক গুরুত্ব ও প্রভাব
ইউরোপের এত উচ্চতায় তাম্রযুগের এমন নিদর্শন এর আগে আর কোথাও মেলেনি। ‘ফ্রন্টিয়ার্স ইন এনভায়রমেন্টাল আর্কিয়োলজি’ পত্রিকায় প্রকাশিত এই প্রতিবেদনটি প্রমাণ করে যে, প্রতিকূল আবহাওয়া এবং দুর্গম উচ্চতা সত্ত্বেও খনিজ সম্পদের সন্ধানে মানুষ কয়েক হাজার বছর আগেই পাহাড়ে নিজেদের আধিপত্য বিস্তার করেছিল। ম্যালাকাইট পুড়িয়ে কপার অক্সাইড এবং সেখান থেকে তামা তৈরির এই জটিল প্রক্রিয়া আদিম মানুষের কারিগরি দক্ষতার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত। কোভা ৩৩৮-এর এই আবিষ্কার আমাদের শেখায় যে, প্রয়োজনীয় সম্পদের খোঁজে মানুষ প্রাগৈতিহাসিক কালেই অসম্ভবকে সম্ভব করতে শিখেছিল।