রঘু ডাকাতের আমল থেকে থানা কেন এখনো পালন করে কালীপুজো!

বার্তা ডেস্কঃ

 

থানায় কালীপুজো নিয়ে বিতর্ক ও ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: এক পর্যালোচনা

নিজস্ব প্রতিবেদক, কলকাতা: পশ্চিমবঙ্গের থানাগুলিতে কালীপুজোর আয়োজন নিয়ে রাজ্যের মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের সাম্প্রতিক মন্তব্য ঘিরে নতুন করে রাজনৈতিক বিতর্ক দানা বেঁধেছে। প্রশাসনের ‘ধর্মীয়করণ’ ও সংবিধানবিরোধিতার অভিযোগ তুলে বিরোধীরা সরব হলেও, বাংলার পুলিশি ব্যবস্থায় কালীপুজোর এক দীর্ঘ ও ঐতিহ্যমণ্ডিত ইতিহাস রয়েছে।

মন্ত্রীর মন্তব্য ও বিতর্ক
মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায় সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে মন্তব্য করেন, “রঘু ডাকাতও ডাকাতি করতে যাওয়ার আগে মা কালীর পুজো করতেন। এটি স্রেফ ধর্মাচার নয়।” তিনি আরও যোগ করেন, থানায় কালীমূর্তি থাকা প্রয়োজন, যাতে অপরাধী ও পুলিশ উভয়েই নিজ নিজ মানসিকতা থেকে দেবীর কাছে প্রার্থনা করতে পারে। প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এবং বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে নিশানা করে তিনি দাবি করেন, অতীতে পুলিশি কার্যক্রমে যে ‘বাধা’ দেওয়া হয়েছিল, তার প্রায়শ্চিত্ত হিসেবেই এখন প্রতিটি থানায় কালীপুজো হওয়া উচিত।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট
ইতিহাসবিদদের মতে, অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীতে বাংলায় রঘু ডাকাত, বিশে ডাকাত বা বুধো ডাকাতের মতো দস্যু দলেরা ডাকাতির আগে মা কালীর আরাধনা করত। লোকবিশ্বাস ছিল, দেবীর কৃপা ছাড়া লুণ্ঠন সফল হয় না। অন্যদিকে, ব্রিটিশ শাসনামলে ভারতীয় পুলিশ কর্মীদের সঙ্গে শ্বেতাঙ্গ কর্তাদের বর্ণবাদী আচরণ ও সনাতন রীতির প্রতি অবজ্ঞার প্রতিবাদে এবং আত্মপরিচয় রক্ষার তাগিদে তৎকালীন পুলিশ কর্মীরা থানার ভেতরেই কালীপুজো শুরু করেন। অসুরবিনাশিনী দেবী কালীর আরাধনা সেই সময়ে বাঙালি বিপ্লবীদের ব্রিটিশবিরোধী লড়াইয়ে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল।

থানায় পুজোর বিশেষত্ব ও সামাজিক মেলবন্ধন
রাজ্যের বহু থানায় ব্রিটিশ আমল থেকেই তান্ত্রিক মতে পুজো হয়ে আসছে। এর মধ্যে দক্ষিণ দিনাজপুরের গঙ্গারামপুর ও মালদার চাঁচল থানার পুজো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। গঙ্গারামপুর থানায় পঞ্চমুণ্ডির আসনে পুজো ও বোয়াল মাছের ভোগের প্রাচীন রীতি প্রচলিত। এই পুজো কেবল ধর্মীয় আচারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; অনেক ক্ষেত্রেই মুসলিম ওসি বা অন্য ধর্মাবলম্বী পুলিশ কর্মীদের সক্রিয় অংশগ্রহণ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বার্তা বহন করে। এছাড়া পুজোর পাশাপাশি রক্তদান শিবির ও বস্ত্র বিতরণের মতো সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডও এই পুজোগুলির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছে।

রাজনৈতিক অবস্থান
বামফ্রন্ট সরকারের আমলে আনুষ্ঠানিকভাবে এই পুজোর সমর্থন না থাকলেও, পুলিশি সংস্কৃতির অংশ হিসেবে অনেক থানায় কর্মীরা নিজস্ব উদ্যোগে পুজো চালিয়ে গেছেন। তৃণমূল জমানাতেও সেই ধারা অব্যাহত রয়েছে। সরকারি কোনো লিখিত নির্দেশিকা না থাকলেও, স্থানীয় স্তরে পুলিশের নিজস্ব ঐতিহ্য হিসেবেই এই পুজো আয়োজিত হয়। তবে মন্ত্রীর সাম্প্রতিক মন্তব্যের পর বিষয়টি ফের রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে নতুন আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *