কাশ্মীরে ধেয়ে আসছে ভয়াবহ হ্রদ বিপর্যয়!
বার্তা ডেস্কঃ
পাহাড়ের চিরচেনা রূপ যে দ্রুত বদলে যাচ্ছে, তা এখন হাতেনাতে টের পাচ্ছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। হিমবাহ বা গ্লেসিয়ার পিছিয়ে যাচ্ছে, বরফের মুখ সরে তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন হ্রদ। আর যেগুলো আগেই ছিল, সেগুলির জলধারণ ক্ষমতা এবং আয়তন বাড়ছে আশঙ্কাজনক হারে। একই সঙ্গে উঁচু পাহাড়ের ঢাল থেকে বিশালাকার তুষারধস বা ‘আইস অ্যাভালাঞ্চ’ ভেঙে পড়ার ভয়ও তাড়া করে বেড়াচ্ছে বিশেষজ্ঞদের।
কাশ্মীরের নির্জন ও মনোরম ওয়ারওয়ান উপত্যকায় এখন ঠিক এই বিপদটাই দানা বাঁধছে। সম্প্রতি নেপালে ঘটে যাওয়া গ্লেসিয়াল লেক আউটবার্স্ট ফ্লাড বা ‘গ্লফ’ (GLOF)-এর ভয়াবহ রূপ দেখার পর ভূতত্ত্ববিদরা সতর্ক করে জানিয়েছেন, কাশ্মীরের ওয়ারওয়ানের ‘লেক-বি’ (Lake-B)-র পাড় ভেঙে যে কোনও মুহূর্তে প্রলয়ঙ্করি বন্যা হতে পারে। পহেলগাম বা গুলমার্গের মতো জনপ্রিয় পর্যটন কেন্দ্র না হওয়ায় ওয়ারওয়ান উপত্যকা এতদিন আলোচনার বাইরে ছিল। কিন্তু প্রকৃতির এই অশনি সংকেত উপেক্ষা করার কোনো উপায় নেই।
গবেষণায় উঠে এল চাঞ্চল্যকর তথ্য পশ্চিম হিমালয়ের কিশতওয়ার অঞ্চলে অবস্থিত এই ওয়ারওয়ান উপত্যকায় মোট ২৭২টি হিমবাহ রয়েছে। ১৯৯০ সালে এখানে হিমবাহ-হ্রদের সংখ্যা ছিল ৭টি, যা ২০২৪ সালে বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১২টিতে। অর্থাৎ, শুধু বরফই গলছে না, পুরো পার্বত্য অঞ্চলের জলবিন্যাস বা হাইড্রোলজির মানচিত্রটাই বদলে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক ও ভারতীয় একদল প্রখ্যাত গবেষকের (আইআইটি ভুবনেশ্বর, আইআইটি ইন্দোর, জম্মু সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি এবং অস্ট্রিয়া, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও চেক রিপাবলিকের বিশ্ববিদ্যালয়) যৌথ গবেষণাপত্র ‘আনরিপোর্টেড মাস মুভমেন্টস অ্যান্ড ফিউচার হ্যাজ়ার্ড ইন দ্য ওয়ারওয়ান বেসিন’-এ এই বিপদের আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে।
কেন চিন্তার কারণ এই ‘লেক-বি’?
- বিশাল আয়তন বৃদ্ধি: ১৯৯৯ সালে ‘লেক-বি’ নামের এই হ্রদের আয়তন ছিল মাত্র ০.০৭৫ বর্গকিলোমিটার। ২০২৪ সালে তা প্রায় ৩০৮ শতাংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ০.৩০৬ বর্গকিলোমিটারে!
- ভয়ানক জলধারণ ক্ষমতা: এই হ্রদে বর্তমানে সর্বোচ্চ ৭৭ লক্ষ ঘনমিটার জল জমা হতে পারে, যার গভীরতা প্রায় ৬০ মিটার।
- হুমকির মুখে পরিকাঠামো: হ্রদের বাঁধ ভাঙলে যে হড়পা বান বা প্লাবন আসবে, তাতে অন্তত ৯টি সেতু, ৪০টি বাড়ি এবং বহু মূল রাস্তা পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে। বন্যার স্রোতের গতিবেগ হতে পারে ঘণ্টায় ১৪ থেকে ২২ কিলোমিটার।
- বিপদের পূর্বাভাস: ২০০৫ সালে এই উপত্যকার ‘গ্লেসিয়ার-বি’ থেকে প্রায় ৫,১৫০ মিটার উঁচুতে ধস নেমেছিল। সেবার জল পর্যন্ত তা না পৌঁছলেও, বর্তমান হ্রদটি ২০০৫ সালের তুলনায় প্রায় সাড়ে তিন গুণ বড়। ফলে এখন নতুন করে ধস নামলে তা সরাসরি হ্রদে আছড়ে পড়বে।
শুধু জল নয়, কাদামাটি ও শিলার প্রাণঘাতী প্রবাহ! ভূতত্ত্ববিদদের মতে, পাহাড়ের ঢালে প্রচুর পরিমাণে আলগা পাথর, মাটি ও নুড়ি জমে রয়েছে। হ্রদের পাড় ভাঙলে সেই জল এই পলি ও পাথর টেনে নিয়ে মুহূর্তে ভয়ংকর ‘ডেব্রি ফ্লো’ বা কাদা-পাথরের বিপজ্জনক স্রোতে পরিণত হবে (ঠিক যেমনটা ঘটেছে নেপালের রাসুয়ায়)। ২০২০ সালেও পাশের ‘লেক-এ’-তে ২.৩৬ কিলোমিটার দূর থেকে ধস এসে পড়েছিল, তবে সে যাত্রা বড় দুর্ঘটনা এড়ানো গিয়েছিল।
জিওমর্ফোলজিস্ট সুজীব করের মতে, “বিশ্ব উষ্ণায়নের কারণে বরফে জমাট বাঁধা মাটি (পারমাফ্রস্ট) গলে যাচ্ছে। ফলে পাথর ও বরফের বাঁধন মারাত্মক দুর্বল হচ্ছে। হিমবাহ পিছোচ্ছে, আর নীচে জমছে বিপুল পলি। ফলে জল, বরফ ও পাথর—তিনটি ব্যবস্থাই একসঙ্গে বদলে গিয়ে পাহাড়কে চরম অস্থিতিশীল করে তুলছে।”
ঝুঁকিতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প ও নিম্নাঞ্চল ওয়ারওয়ান উপত্যকার এই হ্রদ থেকে মাত্র ৫০-৫৫ কিলোমিটার দূরে ইউরোড, কাদেরনা, আনিয়ার, রিনাই ও মেটওয়ানের মতো জনবসতি রয়েছে। বড় আকারের ‘গ্লফ’ বা হিমবাহ-হ্রদ বিস্ফোরণ ঘটলে মাত্র ৬ ঘণ্টার মধ্যে এই লোকালয়গুলিতে জল পৌঁছে যাবে। শুধু তা-ই নয়, এখান থেকে ৯০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত ৮০০ মেগাওয়াটের বুরসার এবং ১,০০০ মেগাওয়াটের পাকাল দুল জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও চরম ক্ষতির মুখে পড়তে পারে।
গবেষকদের মতে, এটি কোনো নির্দিষ্ট দিনের ধ্বংসের ভবিষ্যদ্বাণী নয়, বরং প্রকৃতির বদলে যাওয়া চেহারার একটি কঠিন বাস্তবতা। পাহাড়ি এই বিপদ আর আলাদা কোনো একক ঘটনায় সীমাবদ্ধ নেই; পাহাড়, বরফ ও জল মিলে এক সমন্বিত বিপর্যয়ের ফাঁদ তৈরি করেছে। তাই এখন থেকেই সার্বক্ষণিক নজরদারি, দ্রুত সতর্কবার্তা ব্যবস্থা এবং আগাম প্রস্তুতিই ক্ষয়ক্ষতি এড়ানোর একমাত্র উপায়।